অপহরণকারীদের পা জড়িয়ে ধরে জীবন ভিক্ষা চেয়েছিল আবু সাঈদ। তবে চতুর্থ শ্রেণির এ শিশুর কান্নায় মন গলেনি তাদের। সাঈদ তাদের চিনে ফেলেছিল, পরে লোকজনকে বলে দিতে পারে- এ আশঙ্কায় তারা তাকে হত্যা করে। হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয় চারজন। একজন ঘরের দরজায় পাহারায় ছিল, একজন সাঈদের দুই হাত ধরে রেখেছিল, একজন ধরে রেখেছিল দুই পা, আরেকজন তাকে গলা টিপে হত্যা করে।
সাঈদ হত্যার ঘটনায় গত দুই দিনে আদালতে দুই আসামির ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে উঠে এসেছে এই নৃশংস বর্ণনা।
গতকাল সোমবার সকালে আদালতে জবানবন্দি দেন জেলা আওয়ামী ওলামা লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রকিব। গত রবিবার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন পুলিশের কনস্টেবল এবাদুর রহমান। জবানবন্দিতে উভয়েই হত্যার বিষয়ে একই রকম বর্ণনা দিয়েছেন। আর সাঈদ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার র্যাবের কথিত সোর্স আতাউর রহমান গেদা মিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের মাধ্যমে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।
এবাদুর সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) বিমানবন্দর থানার কনস্টেবল ছিলেন। গ্রেপ্তারের পরপরই তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
পায়ে ধরে জীবন ভিক্ষার পরও মন গলেনি ওদেরআবু সাঈদ
সাঈদ হত্যার প্রতিবাদে এবং হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে গতকাল নগরের কুমারপাড়ায় প্রতিবাদ মিছিল ও মানববন্ধন করেছে স্কুল পরিচালনা কমিটি ও এলাকাবাসী। মিছিলে সাঈদের স্কুলের সহপাঠীরা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী কাজী জালাল উদ্দিন বহুমুখী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও সিলেট ইসলামী একাডেমির শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়।
প্রসঙ্গত, নগরীর হাজী শাহমীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র সাঈদ (৯) গত বুধবার থেকে নিখোঁজ ছিল। গত শনিবার রাতে নগরীর ঝেরঝেরিপাড়ায় পুলিশ কনস্টেবল এবাদুর রহমানের ভাড়া বাসার চিলেকোঠা থেকে তার বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনার পরপরই এবাদুর, রকিব ও গেদা মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। সাঈদের বাবার নাম আবদুল মতিন। তাদের বাসা নগরের দর্জিবন্দ এলাকায়।
আদালত সূত্রে জানা যায়, রকিব গতকাল সকালে সিলেট মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত-২-এর বিচারক ফারহানা ইয়াসমিনের খাস কামরায় জবানবন্দি দেন। এবাদুরের স্বীকারোক্তির সঙ্গে তাঁর জবানবন্দির তথ্যে মিল রয়েছে। বিশেষ করে অপহরণের পর থেকে মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা, তাদের চিনে ফেলায় সাঈদকে হত্যা, লাশ গুম করার পরিকল্পনা বিষয়ে দুজনে একই বক্তব্য দিয়েছেন। তবে অপহরণের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে তাঁরা পরস্পরকে দোষারোপ করছেন।
পায়ে ধরে জীবন ভিক্ষার পরও মন গলেনি ওদের সাঈদ হত্যার প্রতিবাদে এবং খুনিদের ফাঁসির দাবিতে গতকাল সিলেটের শাহী ঈদগাহ এলাকায় মানববন্ধন করে এলাকাবাসী। ছবি : কালের কণ্ঠ
গেদাকে গতকাল সকালে সিলেট মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত-১ এ হাজির করেন সাঈদ হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার এসআই আজিম পাটওয়ারী। তিনি জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গেদাকে ১০ দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন। শুনানি শেষে বিচারক সাহেদুল করিম তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এসএমপির অতিরিক্ত উপকমিশনার রহমত উল্লাহ দুজনের জবানবন্দির বরাত দিয়ে জানান, সাঈদ অপহরণকারীদের পায়ে ধরে জীবন ভিক্ষা চেয়েছিল। কিন্তু চিনে ফেলায় অপহরণকারীরা তাকে হত্যা করে।
জবানবন্দির বরাত দিয়ে পুলিশ সূত্র জানায়, বুধবার সাঈদকে অপহরণ করা হয়। সাঈদের পরিবারের সঙ্গে মুক্তিপণ চেয়ে যোগাযোগের জন্য নতুন সিম কিনে অপহরণকারীরা। সিমটি ব্যবহার করা হয় এবাদুরের মোবাইল ফোনে। এই সিম দিয়ে বুধবার রাতে সিলেট শহর থেকে তাঁরা সাঈদের বাবা ও মামার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কেউ যাতে অবস্থান বুঝতে না পারে সেজন্য বৃহস্পতিবার এবাদুর মোবাইল ফোন নিয়ে জৈন্তাপুর চলে যান। সেখান থেকে ফোনে তাঁরা সাঈদের পরিবারের সঙ্গে মুক্তিপণ নিয়ে দরকষাকষি করেন। প্রথমে পাঁচ লাখ টাকা চাইলেও পরে তাঁরা দুই লাখ টাকায় রাজি হন। এবাদুর বৃহস্পতিবার বিকেলে শহরে ফেরেন। এবাদুর তাঁর জবানবন্দিতে বলেন, টাকা পেলে সাঈদকে ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁদের। কিন্তু এ সময় গেদা বলে, শিশুটিকে ছেড়ে দিলে তাঁদের ‘বিপদ’ হবে। সে সবাইকে তাঁদের নাম বলে দেবে। তাই রাতেই তাঁরা শিশুটিকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন।
হত্যাকাণ্ডে অংশ নেন চারজন। এবাদুর, রকিব ও গেদা ছাড়া আরেকজন হলেন জেলা ওলামা লীগের প্রচার সম্পাদক মুহিবুল ইসলাম। এবাদুরের বর্ণনা অনুযায়ী রকিব দরজা পাহারা দেন, এবাদুর শিশুটির দুই পা, মুহিবুর শরীরের অন্যান্য অংশ ধরে থাকেন, আর গেদা গলাটিপে হত্যা করে। হত্যার পর দুটি বস্তার ভেতরে লাশ ঢুকিয়ে রাখা হয় গুম করার উদ্দেশ্যে। হত্যার পরদিন শুক্রবারও গেদা মুক্তিপণের জন্য সাঈদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে। কিন্তু এরই মধ্যে পুলিশি তৎপরতা শুরু হয়ে যাওয়ায় তাঁরা লাশ গুম করতে পারেননি। এবাদুর জবানবন্দিতে বলেছেন, তাঁদের পায়ে ধরে সাঈদ প্রাণ ভিক্ষা চেয়েছিল। সে বলেছিল এ ঘটনা কাউকে বলবে না, তাঁরা যেন তাকে ছেড়ে দেয়। কিন্তু বিপদের ভয়ে তাঁরা সাঈদকে খুন করেন।
এসএমপির অতিরিক্ত উপকমিশনার রহমত উল্লাহ আরো জানান, সাঈদ হত্যা মামলার ছয় আসামির মধ্যে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিদের আটকের চেষ্টা চলছে।
রকিবকে ওলামা লীগের অস্বীকার : ওলামা লীগের সিলেট জেলা ও মহানগর শাখা দাবি করেছে, সাঈদ খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার আবদুর রকিব এ সংগঠনের কেউ না। জেলা ওলামা লীগের আহ্বায়ক মাওলানা মো. সালাহ উদ্দিন একরাম, সদস্য সচিব মাওলানা আতাউর রহমান শিকদার এবং মহানগর সভাপতি মাওলানা ফখরুল ইসলাম গতকাল যৌথ বিবৃতিতে দাবি করেন, আবদুর রকিব জেলা ওলামা লীগের সাধারণ সম্পাদক নন। তিনি ওলামা লীগের সদস্যও নন।
Leave a Reply